শুধুমাত্র স্কুটারকে সঙ্গী করে কেরালা থেকে লেহ্ হয়ে নেপাল বেড়াতে যাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা

Tripoto
Photo of শুধুমাত্র স্কুটারকে সঙ্গী করে কেরালা থেকে লেহ্ হয়ে নেপাল বেড়াতে যাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা 1/1 by Aninda De
শুধুমাত্র একটা স্কুটারকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়া (ছবি সংগৃহীত)

কখনও উপযুক্ত ঠিকঠাক গাড়ি নেই বলে রোড ট্রিপ ক্যানসেল করে দিয়েছেন, কঠিন রাস্তায় অনেকক্ষণ ধরে আপনার গাড়ি কীভাবে চলবে ভেবে? ঘুরতে বেরোলে, কোন গাড়ি চড়ে যাবেন সেটাও তো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই না? আমাদের মধ্যে অধিকাংশই এমন গাড়ি পছন্দ করব যার কর্মক্ষমতা বেশি, যেমন এস.ইউ.ভি। কারণ আমরা এরকম গাড়ি চাইব না, যে গাড়ি যাত্রাকালে যান্ত্রিক গোলযোগের ফলে আমাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে।

কিন্তু দাঁড়ান! আলেপ্পির এই ২৩ বছরের যুবকটি, কোচিন রিফাইনারিজ লিমিটেডের এক প্রাক্তন কর্মী, বলছেন সম্পূর্ণ অন্য কথা। "বেড়ানোটাই যদি আপনার একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে কি গাড়ি সঙ্গে আছে সেটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক", বললেন সাজিন - সাজিন ৫৩ দিন ধরে শুধুমাত্র তার স্কুটার চেপে, প্রায় ১২০০০ কিলোমিটারের দুঃসহ দূরত্ব অতিক্রম করে কেরালা থেকে নেপাল ঘুরে এসেছেন। কী অসীম দুঃসাহস, তাই না!

সাজিন সাথিশনের সাথে আলোচনায় উঠে এল তাঁর এই অভাবনীয় কীর্তির কথা এবং তিনি আমাদের অকপটে জানালেন তাঁর কেরালা থেকে নেপাল ভ্রমণের গল্প। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ আমরা তুলে ধরলাম আপনাদের জন্যে:

সাজিন সাথিশন কে?

"আমি কেরালার এফ.সি.আই থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্টে পাস করে কোচিন রিফাইনারিজ লিমিটেডে দেড় বছর চাকরি করি। কিন্তু ভ্রমণের প্রতি এই ভালোবাসাটা কিছুতেই দমাতে পারছিলাম না। তারপর হঠাৎ একদিন নিজের স্কুটার চেপে উত্তরদিকে যাওয়ার ইচ্ছেটা চেপে বসল। কিছু দ্বিধা ছিল কিন্তু যাত্রা শুরু করতেই সে সব কোথায় মিলিয়ে গেল, বুঝতেও পারলাম না।"

আপনি কীভাবে এইরকম দুঃসাহসিক পর্যটক হয়ে উঠলেন?

"চিরকালই আমার ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগতো, যদিও ভ্রমণের প্রতি আমার ভালবাসা কতটা জোরালো সেটা বুঝতে পেরেছি বছর তিনেক আগে। ২০১৫ সাল নাগাদ আমি আসতে আসতে চারপাশের বিভিন্ন জায়গায় যেতে আরম্ভ করি, কখনও একা, কখনও বন্ধুদের সঙ্গে।

কিন্তু দৈনন্দিন কর্পোরেট জীবনের রোজনামচায় মনে হচ্ছিল জীবনে দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঝুঁকি যে অনেক সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু সব ঝুটঝামেলা পিছনে ফেলে মুক্ত মনে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছেটাও প্রবল হয়ে উঠছিল। তাই একদিন হঠাৎ করেই চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। তারপর এই স্কুটার চেপে নেপাল ব্যাপারটা হল। খুব শান্তি পেয়েছিলাম, অফিসের চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে আর ফিরে আসতে হবে না জেনে। এইভাবেই আমি আজকের আমি হয়ে উঠলাম।"

স্কুটারে চেপে নেপাল যাওয়ার ভাবনাটা আপনার মাথায় কীভাবে এল? সঙ্গে কোনও সঙ্গীসাথী ছিল?

"আসলে কোথাও থেকে এই আইডিয়াটা আসেনি। হঠাৎ করে নিজের মাথাতেই এই খেয়ালটা চেপে বসে। বোধহয় আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে রোড ট্রিপে বেরোলে, স্কুটারটা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় নেই আমার কাছে আপাতত। আগে স্কুটারে করে হাম্পি গেছি বন্ধুদের সঙ্গে, কিন্তু নেপাল যাওয়ার দুরত্বটা একটু বেশিই।

সারা ভারতবর্ষ পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া, দুশ্চিন্তা তো ছিলই, কিন্তু আমি এটাও জানতাম যে যদি আমি মনে করি যে এটা আমি পারবই, তাহলে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত পেরেছি, আর পুরো ব্যাপারটা করতে পেরে খুব ভাল লাগছে। আমার বন্ধু জিথীন আমার সঙ্গে ছিল এই রোড ট্রিপে, তাই মজাও হয়েছে অনেক বেশি।"

যাত্রাপথে কোন রুট ধরে এগিয়েছিলেন এবং কোন কোন জায়গা দেখলেন এই যাত্রাপথে?

মোটামুটি আলেপ্পি - মুরুদেশ্বর - গোকার্না - গোয়া - মহাবালেশ্বর - মুম্বই - মধ্যপ্রদেশের প্রান্তদেশ - জয়পুর - দিল্লি - চন্ডীগড় - হিমাচল - লেহ্ - শ্রীনগর - দিল্লি - আগ্রা - গোরোখপুর - সোনাউলি হয়ে নেপাল গিয়েছিলাম, তবে রুটের ধরাবাঁধা কোনও প্ল্যান ছিল না।

এই কয়েকদিনে আমি অসংখ্য সুন্দর সুন্দর জায়গায় গেছি, তাই অল্প কথায় সবটা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তবে কয়েকটা জিনিস আমি কখনওই ভুলতে পারব না - অমৃতসরের গোল্ডেন টেম্পল এবং কাশ্মীর ও নেপালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আর স্কুটারে চেপে যেন সবকিছু আরও বেশি করে সুন্দর এবং উপভোগ্য মনে হয়েছে।"

জনপ্রতি খরচ কত হয়েছে এই গোটা ট্রিপটায়?

"মাথাপিছু প্রায় ৭৫০০০ থেকে ৮০০০০ টাকা। চাকরি করে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম, আর বাকি পুরোটাই ছিল বাজেট ট্র্যাভেল, কোথাও একবিন্দু বিলাসিতা ছিল না।"

কোনো সমস্যায় পড়েছিলেন যাত্রাপথে? আমাদের যেসকল পাঠক এরকম রোড ট্রিপ করতে চায় তাদের কী উপদেশ দেবেন?

"ভাগ্যক্রমে, ৫৩ দিনের এই সফরে সেভাবে কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি। কোথায় যাচ্ছি, কত টাকা আছে, সেটা আমরা জানতাম, সেই মতোই এগিয়েছি। তাও আমরা মানসিকভাবে যেকোনো ঝামেলায় পড়তে প্রস্তুত ছিলাম। যাতে সবসময় যোগাযোগ বজায় রাখতে পারি, তাই আমার বন্ধু আমার স্কুটারে একটা পোর্টেবল চার্জার লাগিয়ে দিয়েছিল, তাই ফোন নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি।

সমস্যা বলতে একটাই ব্যাপার মনে পড়ছে। শ্রীনগরে যখন রাত্রিবেলায় আমি আর আমার বন্ধু স্কুটার চালাচ্ছিলাম, তখন একটা গাড়ি আমাদের পিছু নেয় এবং রাস্তা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। মনে হয়েছিল যে খুব বিপদে পড়লাম, হয়তো ডাকাতি হবে, কিন্তু কোনওভাবে আমরা গাড়িটাকে এড়িয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিলাম।

এই থেকে আমরা একটা শিক্ষা পেয়েছিলাম : রাতে গাড়ি চালিয়ে এগোনো বিপদজনক হতে পারে। তাই আমি পাঠকদের বলব, রাত্রিবেলায় গাড়ি না চালানোই ভালো, সূর্য ডোবার আগে যতটা পথ যাওয়া যায়, ততটাই যান।"

দু একটা এরম স্মরণীয় ঘটনা বলুন যেগুলো আপনি আমাদের পাঠকদের জানাতে চান

"কেরালা থেকে নেপাল গিয়ে আবার কেরালা ফিরে আসার পথে ভাল এবং খারাপ, সব রকম অভিজ্ঞতাই হয়েছে। তবে যেটা ভোলা যাবে না সেটা হল গোল্ডেন টেম্পলে কাটানো দুই দিন।

একটু সেবার বদলে আমি ওখানে বিনামূল্যে থাকতে পেরেছিলাম, এমনকী খাবার বা জল ও ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আমার চারপাশের মানুষদের নিঃস্বার্থ চিন্তাভাবনা এবং অন্যের উপকার করার প্রতি তাঁদের দৃঢ় অঙ্গীকার দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। ওই কয়টি দিন আমাকে সত্যি বদলে ফেলেছে। নিজের মনে আনন্দ এবং প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। যদি ঘুরতে না বেরোতাম, তাহলে হয়তো এমন অভিজ্ঞতা কোনওদিন লাভ করতে পারতাম না।

দ্বিতীয়ত, যখন আমি নাসিকের হরিহর ফোর্টের কাছে ছিলাম তখন আশেপাশের কোন এ.টি.এম-এ টাকা না থাকায় বেশ অসুবিধায় পড়েছিলাম। আমি আর আমার বন্ধু দুজনেই তখন ক্লান্ত, ক্ষুধার্থ এবং উদ্বিগ্ন। এই সময়ে এক বয়স্ক ব্যক্তি তাঁর দোকানের সামনে আমাদের তাঁবু খাটানোর অনুমতি দেন, আমাদের উনি খাবার ও দেন, কিন্তু বিনিময়ে তিনি কিচ্ছু নেননি। এরম নিঃস্বার্থ ব্যবহার আমায় অভিভূত করেছে। আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি গ্রামগঞ্জের মানুষজন আজও অত্যন্ত সৎ এবং তাঁরা অচেনা লোকজনের দেখাশোনার সময়ে পিছু হটেন না। মনুষ্যত্ব আজও বেঁচে আছে।"

এক কথায় আপনার সমগ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বলতে হলে কী বলবেন?

"ভ্রমণই যদি আপনার একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে আর কোনও কিছুতে কিছু যায় আসে না, এমনকী আপনার সঙ্গে কী গাড়ি আছে, সেটাও অপ্রাসঙ্গিক।"

নিজের বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ট্রিপোটোর সঙ্গে ভাগ করে নিন আর সারা বিশ্ব জুড়ে অসংখ্য পর্যটকদের অনুপ্রাণিত করুন।

বিনামূল্যে বেড়াতে যেতে চান? ক্রেডিট জমা করুন আর ট্রিপোটোর হোটেল স্টে আর ভেকেশন প্যাকেজে সেগুলো ব্যাবহার করুন।

(এটি একটি অনুবাদকৃত/অনুলিখিত আর্টিকেল। আসল আর্টিকেল পড়তে এখানে ক্লিক করুন!)