শীতকালীন গ্রাম বাংলার মিঠাই উৎসবের ভিড়ে রয়েছে বেশ কিছু অজানা সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পরম্পরার বৈশিষ্ট্য

Tripoto
Photo of শীতকালীন গ্রাম বাংলার মিঠাই উৎসবের ভিড়ে রয়েছে বেশ কিছু অজানা সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পরম্পরার বৈশিষ্ট্য 1/2 by Deya Das
পৌষপাবর্ণের মহাসমারোহ (ছবি সংগৃহীত)

“বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য”-র সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা আমাদের দেশ ‘ভারতবর্ষ’; যার প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে হৃদয়স্পর্শী আবেগের ছোঁয়া। আর এই কথাটির মূল্যবোধ প্রকাশ করতে গেলে নজর রাখতে হবে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিকে। এমন নানা উৎসব আছে যেগুলোর ঐতিহাসিক উৎস বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম। আবার তার মধ্যে কিছু কিছু উৎসব বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় উদযাপিত হয়। আর এগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ১৪ই জানুয়ারি মতান্তরে ১৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া মকর সংক্রান্তি বা পৌষসংক্রান্তি; যার অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যও রয়েছে।

অনুষ্ঠানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

পৌষ পার্বণ অনুষ্ঠানটি মূলত ফসলি উৎসব যা দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত হয়ে থাকে। পৌষ মাসের শেষ দিনে এই উৎসবের শুভারাম্ভ হয় এবং সমাপ্তি ঘটে তিন দিন পরে। হাজার হাজার বছরের পুরনো এই উৎসবের কথা পুরাণেও উল্লেখ আছে। পৌষ পার্বণ উৎসবের সূচনা নিয়ে বেশ কিছু লোককথা কথিত আছে। জড় বিজ্ঞান অনুযায়ী সূর্যের গতি দুই প্রকার- উত্তরায়ন এবং দক্ষিণায়ন। মূলত মাঘ মাস থেকে আষাঢ় মাস উত্তরায়ন এবং শ্রাবণ মাস থেকে পৌষ মাস দক্ষিণায়ন। ৪ঠা জানুয়ারি দিন ছোট এবং রাত বড় হয়। এরপর সূর্য দক্ষিণায়ন থেকে উত্তরায়নে প্রবেশ করে। তখন দিন বড় এবং রাত ছোট হতে শুরু করে। সূর্য এইদিন ধনু রাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। তাই এই পৌষ মাসের শেষদিনকে মকর সংক্রান্তি বা পৌষসংক্রান্তি বলা হয়।

এছাড়াও বলা হয় মকর সংক্রান্তির দিন এই তিথিতে মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম ইচ্ছাকৃতভাবে শরশয্যা গ্রহণ করেছিলেন।

অন্যদিকে,দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়। এই দিনে বিষ্ণুদেব অসুরদের বধ করে তাদের কাটা মুন্ডু`মন্দিরা´পর্বতে পুঁতে দেন। তাই পৌষ পার্বণে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তি সূচনা হয়।

আবার, সূর্যদেব এই দিনে নিজের ছেলে মকর রাশির অধিপতি শনির বাড়ি বেড়াতে যান। তাই এই দিনটিকে বাবা-ছেলের সম্পর্কে বিশেষ দিন হিসেবেও ধরা হয়।

প্রাকৃতিক রূপে গ্রামবাংলায় পৌষ পার্বণ:

পৌষ পার্বণ উৎসব গ্রাম বাংলার একটি অন্যতম প্রধান উৎসব। এই সময় গ্রামের প্রতিটি গৃহের আঙিনা গোবর দিয়ে নিকানো হয়। তুলসী মন্দিরের সামনে চালের গুঁড়ো দিয়ে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়। যাকে প্রচলিত গ্রাম্য ভাষায় 'নেড়া নেড়ি' বা 'বুড়ো বুড়ি' বলা হয়। তারপর ঢেঁকিতে সিঁদুর মাখানো হয়। ঢেঁকি ঘরের সামনে পিটুলির গোলা এক বিশেষ ধরনের গাছের আঠা সঙ্গে ঘন করে গুলে আঁকা হয় আলপনা। তুলসী মঞ্চের সামনে রাখা হয় নানা রকমের পিঠেপুলি,পাটিসাপটা।

উৎসবে তিনদিন মাটির সরা পোড়ানো হয়। প্রথম দিন সরার ভিতরে ধানের তুষ রেখে পাটকাঠির আগুনে পুড়িয়ে সরা তৈরি করা হয়। নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে সরা পিঠে তৈরি করা হয় এবং তা প্রথমে বাড়ির পালিত গরুকে নিমিত্ত করা হয়। পৌষ পার্বণ অনুষ্ঠানে মকর সংক্রান্তির দিন ভোরবেলা বাড়ির সদর দরজার সামনে গোবরের গোলাকার পিণ্ডের উপর ধান, দূর্বা,যবের শিস, সিঁদুর দিয়ে "পৌষবুড়ি" তৈরি করে পুজা করা হয় এবং এই সময় বাড়ির মহিলারা বিভিন্ন গান গায় যেমন "পৌষ মাস লক্ষ্মী মাস না যাইও ছাড়িয়া, ছেলেপিলেকে ভাত দেব খান্দা ভরিয়া"। আবার "এসো পৌষ যেও না জন্ম জন্ম ছেড়ো না।" এছাড়াও কোথাও কোথাও মোরগ লড়াই, সুন্দর সুন্দর ঘুড়ি উৎসব দেখতে পাওয়া যায়।

পার্বণের মিষ্টিমুখ:

Photo of শীতকালীন গ্রাম বাংলার মিঠাই উৎসবের ভিড়ে রয়েছে বেশ কিছু অজানা সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পরম্পরার বৈশিষ্ট্য 2/2 by Deya Das
বিভিন্ন রকমের আয়োজন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই (ছবি সংগৃহীত)

হাজার হাজার বছরের পুরনো বাঙালির এই চিরাচরিত পার্বণের প্রধান মিষ্টি হল চালের গুঁড়ো, নারকেল, দুধ,খেজুর গুড় দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পিঠে, পাটিসাপটা। এছাড়া নলেন গুড়ের পায়েস, চিতোই পিঠের পায়েস, আস্কে পিঠে, গোকুল পিঠে, ভাজা পিঠে, চন্দ্রপুলি, দুধপুলি,আঁদোশা, রাঙা আলুর পান্তুয়া, মালপোয়া,রসবড়া গুড় দিয়ে তিলের লাড্ডু প্রভৃতি বিভিন্ন রকমের মিষ্টির আয়োজন করা হয়।

এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নদিয়ার কৃষ্ণনগর শহরের অধর মিষ্টান্ন ভান্ডারের এই পৌষপার্বণে নির্মিত মিষ্টি বিশেষ। সরভাজা সরপুরিয়া সাথেসাথে নলেন গুড়ের মিষ্টি ও পাটিসাপটা

সমানভাবে জনপ্রিয়। এছাড়াও শিলিগুড়ি শহরের ফুটপাতে, আলিপুরদুয়ারের বেলতলা মোড়ের দোকানে পিঠেপুলি, পাটিসাপটা,পায়েস, ক্ষীর, মালপোয়া বিক্রি করতে দেখা যায় এই সময়। রানিনগরের ট্রেনেও বিক্রি করা হয় চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি পিঠে। বিধানরোডের দুপাশে তিলের খাজা, মুড়ি-চিড়ের মোয়া, নারকেলের দুধ দিয়ে পাটিসাপটা বিক্রি করা হয়। বিধান রোডের পাশে একটি জনপ্রিয় মিষ্টির দোকানের সামনে মালপোয়া বিক্রি করা হয়। মাটিগাড়ার শপিং মলে প্রসিদ্ধ দোকানে বিক্রি করা হয় এই পার্বণ সংক্রান্ত মিষ্টি বিশেষ।

অঞ্চল ভেদে পৌষ পার্বণের নামকরণ:

গ্রাম বাংলার পৌষ পার্বণের আনন্দ যেভাবে সবার মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে ,ঠিক সেই ভাবেই বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে এই অনুষ্ঠান পালন করা হয়। যেমন- নেপালে এই অনুষ্ঠানের নাম মাঘী, পাঞ্জাব, হরিয়ানা,হিমাচল, জম্মুতে লহরী, বিহার, ঝাড়খন্ডে খিচড়ি পর্ব, তামিলনাড়ুতে পোঙ্গল, গুজরাটে উত্তরায়ন, অসমে ভোগালী বিহু, মহারাষ্ট্রে তিলগুল, কর্ণাটকে ইল্লু বিল্লা। এছাড়াও থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও,মায়ানমারে থিং ইয়ান প্রভৃতি।

পৌষ পার্বণ সংক্রান্ত উৎসব ও মেলা:

আউনি বাউনি:- পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষ্যে অন্যতম একটি শস্য উৎসব। আমন ধানের শিষ দিয়ে বিনুনী করে তৈরি করা হয় আউনি বাউনি। ধানের শিষ না থাকলে ২/৩ তে লম্বা খড় পাকিয়ে ধানের শিষ, মুলোর ফুল,সর্ষে ফুল,আমপাতা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা হয় এই আউনি বাউনি। এটি ধানেরগোলা, ঢেঁকি, বাক্স এবং ঘরের চালে গুঁজে দেওয়া হয়।

দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং বীরভূমের বিভিন্ন মেলা:

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার “সাগরদ্বীপে কপিল মুনির আশ্রম”কে কেন্দ্র করে পৌষপার্বণে এক বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন পুণ্যস্নান করার জন্য।

এছাড়া বীরভূমের দুটি মেলা খুব বিখ্যাত তার মধ্যে একটি হলো কেন্দুলী গ্রামে “জয়দেবের মেলা”। আরেকটি আমাদের সবার খুব পরিচিত শান্তিনিকেতনের “পৌষমেলা”। যেটি প্রধানত ৭ই পৌষ থেকে ৯ই পৌষ পর্যন্ত হয়ে থাকে। যার প্রধান আকর্ষণ হল বাংলার ‘লোকসংগীত উৎসব’।

নিজের বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ট্রিপোটোর সঙ্গে ভাগ করে নিন আর সারা বিশ্ব জুড়ে অসংখ্য পর্যটকদের অনুপ্রাণিত করুন।

বিনামূল্যে বেড়াতে যেতে চান? ক্রেডিট জমা করুন আর ট্রিপোটোর হোটেল স্টে আর ভেকেশন প্যাকেজে সেগুলো ব্যাবহার করুন