পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৭ দিনের জন্যে মায়ানমার : জেনে নিন বিদেশ ভ্রমণের সমস্ত তথ্য, কোথায় যাবেন আর কী দেখবেন

Tripoto
Photo of পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৭ দিনের জন্যে মায়ানমার : জেনে নিন বিদেশ ভ্রমণের সমস্ত তথ্য, কোথায় যাবেন আর কী দেখবেন 1/1 by Aninda De
প্যাগোডা সজ্জিত দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অভূতপূর্ব (ছবি সংগৃহীত)

করোনা পরিস্থিতি যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার দিকে এগোচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে আন্তর্জাতিক ডেস্টিনেশনগুলোর দরজা খুলে গেল আমরা কোথায় যেতে পারি। সাধ্য এবং সামর্থের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ বহুকাল ধরেই পর্যটকদের প্রিয় - যেমন ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ইত্যাদি। কিন্তু হাতের কাছেই, এই দেশগুলোর উত্তরে আছে আরেক স্বপ্নের দেশ - মায়ানমার। স্বর্ণালী সমুদ্রতট, নাইটলাইফ, শহুরে আধুনিকতা এবং গ্রাম্য নান্দনিকতা মিলে মিশে পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠছে অন্যতম প্রিয় একটি গন্তব্য।

মায়ানমার যাওয়ার ভিসা পেতে কী করতে হবে?

ভারতীয় নাগরিক হওয়ার সুবাদে মায়ানমারের ভিসা পাওয়া এখন হয়ে উঠেছে খুবই সহজ। যদি আপনার ভ্রমণের সময়সীমা ২৮ দিনের কম হয়, তাহলে বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দ্বারা ই-ভিসার জন্যে আবেদন করতে পারেন। সেই ই-ভিসা নিয়ে আপনি মান্ডালে, ইয়াঙ্গন বা নে পি ত্ব বিমানবন্দরের মাধ্যমে মায়ানমারে প্রবেশ করতে পারবেন।

বিশদে জানতে আপনি এই লিঙ্কটি ব্যবহার করতে পারেন : www.myanmarvisa.org

মায়ানমার কীভাবে প্রবেশ করবেন?

মায়ানমার ভ্রমণের সমস্ত খরচের একটি বড় অংশ নির্ভর করবে আপনি স্থলপথে, বিমানপথে না কি উভয় পথের সাহায্যে মায়ানমার যাচ্ছেন তার উপরে। আসুন, ব্যাপারটি একটু বুঝে নেওয়া যাক

সরাসরি সড়কপথে : হাতে সময় থাকলে এবং কম বাজেটে যেতে হলে এটাই সবথেকে ভাল পন্থা। আপনি মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে সরাসরি সড়কপথে মায়ানমার যেতে পারেন। এপারের মোরে গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটেই ওপারের তামু গ্রামে পৌঁছে যেতে পারেন। তারপর বাসে করে চলে যান মান্ডালে।

সরাসরি বিমানপথে : কলকাতা থেকে বিমানপথে চলে যেতে পারেন ইয়াঙ্গন। এক্ষেত্রে সময় লাগবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা।

বিমান ও সড়কপথের মাধ্যমে : হাতে যদি একটু সময় থাকে, আর আপনি চান মাঝে আরেকটি বিদেশী গন্তব্যে ঘুরে আসতে, থাকলে সরাসরি ফ্লাইটে চলে যান কলকাতা থেকে ব্যাংককে। সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে নিন। তারপরে সেখান থেকে বাসে করে সড়কপথে চলে যান মায়ানমারে। এক্ষেত্রে যা যাতায়ত খরচ হবে, তা সরাসরি মায়ানমার যাওয়ার থেকে বেশ কম। ব্যাংককের মে সুট অঞ্চল থেকে বর্ডার পেরিয়ে মায়ানমারের মায়াওয়াদদী অঞ্চলে পৌঁছে যেতে পারবেন। সেখান থেকে বাসে করে চলে যান ইয়াঙ্গন।

মায়ানমারে কীভাবে ঘুরবেন?

মায়ানমারে কী কী দেখবেন, কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন সেই নিয়ে হাজির করেছি নীচের তথ্যসমূহ। মোটামুটি ৭ দিনের সফর আপনি এই পরিকল্পনামাফিক করতে পারবেন।

ইয়াঙ্গন

সফর শুরু করতে পারেন ইয়াঙ্গন থেকে, যা মায়ানমারের সবথেকে বড় শহর এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র। দেখতে পাবেন প্রচুর ব্রিটিশ আমলের বাড়ি। শহরের কেন্দ্রে রয়েছে ২০০০ বছর পুরনো সুল প্যাগোডা, যাকে ঘিরেই জেগে উঠেছে বাকি শহরটি। ব্রিটিশ আমলে ভারতের সাথে মায়ানমারের গভীর যোগাযোগ থাকায় এখনও শহরের পরতে পরতে একটি ভারতীয় ছাপ স্পষ্ট। ইয়াঙ্গনের বুকে এখনও রয়েছে পুরনো এক যুগের আভাস, যা এনে দেয় ইতিহাস আর নস্টালজিয়ার এক নিবিড় মিশ্রণ।

ইয়াঙ্গনে কী কী করবেন

শুরু করার পক্ষে ইয়াঙ্গন বেশ ভাল জায়গা। ধীরে সুস্থে আসতে আসতে চিনে নিন নতুন দেশটিকে।

শ্বেডাগন প্যাগোডা : মায়ানমারের পবিত্রতম বৌদ্ধ প্যাগোডা হিসাবে পরিচিত এই প্যাগোডাতে আছে বলে মনে করা হয় চার জন বুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, যার মধ্যে আছে গৌতম বুদ্ধের কেশ রাশিও।

সুল প্যাগোডা : ইয়াঙ্গন তথা বর্মার ইতিহাসের সাক্ষী এই প্যাগোডা।

কান্দাগি লেক : এই লেক এবং পার্শ্ববর্তী জাতীয় উদ্যান পরিবারের সাথে পিকনিকের জন্যে একেবারে আদর্শ।

নওয়েসাঙ্গ : ইয়াঙ্গন থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে এই বিচরিসর্টটি অবস্থিত। এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলনাহীন।

বাগান

ইয়াঙ্গন থেকে রাতের বাস ধরে বা একটি প্লেন ধরে চলে আসুন ৮০০কিমি দূরের বাগান শহরে। নামে যেমন বাগান, তেমনি রূপের দিক থেকেও অত্যন্ত সুন্দর এই প্রাচীন শহরটি। সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের ছাপ এই শহরের মজ্জায় মজ্জায়। ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত এটি ছিল পাগান সাম্রাজ্যের রাজধানী। এখনও রয়েছে প্রায় ২০০০ বৌদ্ধমন্দির, প্যাগোডা এবং গুম্ফা।

বাগানে কী কী করবেন :

মন্দির ভ্রমণ : ঘুরে আসুন আনন্দ মন্দির, সেজিগণ প্যাগোডা, ঠাতবিন্ন্যু মন্দির, ধম্মাইয়াংই বা সুলেমানি মন্দির।

পোপা পাহাড় জাতীয় উদ্যান : পবিত্র পোপা পাহাড়ের চারপাশের এই উদ্যানটি স্থানীয়দের কাছে তীর্থক্ষেত্রের মর্যাদা বহন করে।

মান্ডালে

চলুন ঘুরে আসি মায়ানমারের সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে। বাগান থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে, মাত্র ৪ ঘণ্টার দুরত্বে মান্ডালে মায়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এশিয়ার বিভিন্ন শহরের মতই এখানেও আছে এক দ্বৈতসত্ত্বা - উপরে উপরে প্রচন্ড ব্যস্ততা এবং কোলাহলে মোড়া, কিন্তু ভিতরে ভিতরে এখনও পুরনো রীতিনীতি আঁকড়ে চলা। শহরের মধ্যে এবং চারপাশে আছে নানান গুম্ফা এবং প্যাগোডা। আছে নতুন প্রজন্মের উন্নতির প্রচেষ্টার প্রয়াস। আর পুরনো চায়ের দোকানগুলোতে বর্ষীয়ান নাগরিকদের আড্ডার প্রচলন। সব মিলিয়ে মান্ডালে যেন এক টুকরো মায়ানমার।

মান্ডালেতে কী কী করবেন

মান্ডালে হিল : ঘুরে আসুন স্থানীয় তীর্থক্ষেত্র মান্ডালে হিল থেকে।

স্বেনন্দও গুম্ফা : মায়ানমারের প্রাচীন রাজপরিবারের চিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে এই গুম্ফাটি।

ইয়াদানাবন জুলজিকাল উদ্যান : আলিপুর চিড়িয়াখানার মতন ঐতিহাসিক এই চিড়িয়াখানায় যেতে পারেন যদি দেখতে চান বার্মিজ হাতি, লেপার্ড, বাঘ বা লুপ্তপ্রায় বার্মিজ রুফড কচ্ছপ।

ইনলে লেক অঞ্চল

এইবারে এসে পড়েছি আমাদের ট্যুরের শেষ ভাগে, ইনলে লেক অঞ্চলে। মান্ডালে থেকে ইনলে লেকে বাসে করে আসতে সময় লাগবে ৫ ঘণ্টা। মায়ানমারের অন্যতম সুন্দর জায়গা নামে খ্যাত এই জায়গাটি প্রচন্ড বিখ্যাত এবং সবথেকে বেশি পর্যটক ও আসেন এই অঞ্চলে। প্রায় ৪৫ বর্গ মাইল জায়গা জুড়ে এই লেকের উপরে আছে অনেকগুলো ভাসমান বাগান এবং কিছু জলের তলায় অবস্থিত বৌদ্ধ মন্দির (যার কয়েকটি এখনও জলের উপরে উঁকি দেয়!) এবং এই লেক অঞ্চলে আছে প্রচুর স্থানীয় জলজ প্রাণী, যা অন্য কোথাও দেখতে পাবেন না।

ইনলে লেক অঞ্চলে কী কী করবেন

ঘুরে দেখতে পারেন ভাসমান বাগান, জেলেদের গ্রাম, উষ্ণ প্রসবন এবং স্থানীয় ওয়াইনারী থেকে।

নিকটবর্তী হ্যান্ডিক্রাফটস ভিলেজ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন নানা স্মৃতিচিহ্ন।

লেক অঞ্চলের কাছাকাছি ইনডেইন অঞ্চলে রয়েছে প্রচুর প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির, যা পর্যটকদের অত্যন্ত প্রিয়।

মায়ানমারে কী কী খাবেন

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে কোনও দেশে যাওয়ার মানেই হল সেখানকার অসাধারণ স্থানীয় খাবার খাওয়ার সুযোগ পাওয়া। খেয়ে দেখতে পারেন এই ডিশগুলো :

১. ফিশ রাইস বা শান স্টাইল রাইস : বাঙালিদের প্রিয় মাছভাত এবার অন্য রূপে। এই রাইসে দেওয়া হয় মিষ্টি জলের মাছ, রসুনের তেল এবং হলুদ। খেয়ে দেখতে পারেন বার্মিজ কারি দিয়ে।

২. টি শপ মিল : মান্ডালের টি-শপগুলো বিখ্যাত। আয়েশ করে বসে খান চা, বান পাউরুটি, বিভিন্ন নোনতা স্ন্যাকস এবং গল্প জুড়ে দিন স্থানীয় আড্ডাবাজদের সঙ্গে।

৩. নাঙ্গই থকে : চিকেন, মাছ, সেদ্ধ ডিমের টুকরো দিয়ে তৈরি এই শুকনো নুডলস এর ডিশ খেতে ভুলবেন না।

৪. শান স্টাইল তফু নুডল : ম্যারিনেট করা পর্ক, চিকেন, সবজি, মশলা, চিলি অয়েল দিয়ে ঝোল ঝোল রাইস নুডলসের ডিশ, ওপরে দিয়ে দেওয়া হয় ঝাল হলুদ বার্মিজ গ্রেভি।

৫. মোহিঙ্গা : সবশেষে রইল মোহিঙ্গা। মোহিঙ্গার প্রধান উপকরণ রাইস নুডলস এবং মুচমুচে থোড় দিয়ে। হাল্কা খাবার হওয়ায় এটি একটি জনপ্রিয় বার্মিজ জলখাবার।

বর্তমানে ১ ভারতীয় মুদ্রার মূল্য মায়ানমারের মুদ্রায় ১৮.২২ । তাই দেরি না করে, অবস্থা স্বাভাবিক হওয়া মাত্র ঘুরে আসুন মায়ানমার থেকে।

নিজের বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ট্রিপোটোর সঙ্গে ভাগ করে নিন আর সারা বিশ্ব জুড়ে অসংখ্য পর্যটকদের অনুপ্রাণিত করুন।

বিনামূল্যে বেড়াতে যেতে চান? ক্রেডিট জমা করুন আর ট্রিপোটোর হোটেল স্টে আর ভেকেশন প্যাকেজে সেগুলো ব্যবহার করুন।