ভারত এবং বাংলাদেশের চিরন্তন এক ঐতিহ্য: লোকসংগীত

Tripoto
Photo of ভারত এবং বাংলাদেশের চিরন্তন এক ঐতিহ্য: লোকসংগীত 1/7 by Deya Das

ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের সংগীতের অন্যতম একটি ধারা হল লোকগীতি বা লোকসংগীত। আদিম যুগ থেকে প্রতিকূলতার বিপরীতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের সঙ্গী হিসাবে এই সমস্ত গান মানুষ তৈরি করেছেন। মূলত পল্লী জনজীবনে যে গানগুলি মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়িয়ে প্রসার লাভ করেছে সেগুলোই লোকসংগীত হিসেবে পরিচিত।

অঞ্চলভেদে লোকগানকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চল। পূর্বাঞ্চলের লোকসংগীতের মধ্যে মূল ধারাটি হল ভাটিয়ালি। এছাড়াও রয়েছে সারি, জারি, মুর্শিদি পালাগান ইত্যাদি। উত্তরাঞ্চলের ভাওয়াইয়া বিখ্যাত। পশ্চিমাঞ্চলে ঝুমুর গানকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও টুসু, ভাদু, রাঢ়ের বাউল, ছড়ার গান, হাপু গান ইত্যাদি প্রচলন রয়েছে।

বিভিন্নরকম লোকগীতির প্রাককথা :

ভাটিয়ালি গান-

Photo of ভারত এবং বাংলাদেশের চিরন্তন এক ঐতিহ্য: লোকসংগীত 2/7 by Deya Das

নদীমাতৃক বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষের অন্যতম লোকসংগীত হল ভাটিয়ালি। মাঝি-মাল্লা, কৃষক, মেহনতী মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম-ভালোবাসা, ভক্তির পরিচয় ফুটে ওঠে এই গানের মাধ্যমে। সুপ্রাচীনকাল থেকে ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুরের কবিরা এই গান রচনা করে আসছেন। প্রকৃতপক্ষে এই গানের সুরকে ভাটিয়ালি বলা হয়। সাধারণত এই গানের দুই/তিনটি শব্দ নিয়ে শব্দগুচ্ছ তৈরি করে একবারে উচ্চারিত হয়ে থাকে এবং উচ্চারণ এরপর একটি দীর্ঘ টান সংযুক্ত হয়। ভাটিয়ালি গানে কোন রকম বাদ্যযন্ত্র খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। নদীর জলে বৈঠা টানার শব্দ, নদীর ঢেউয়ের শব্দ, প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত বিভিন্ন শব্দ, বাঁশি ইত্যাদির প্রয়োগ দেখা যায়।

ভাওয়াইয়া গান-

Photo of ভারত এবং বাংলাদেশের চিরন্তন এক ঐতিহ্য: লোকসংগীত 3/7 by Deya Das

ভাওয়াইয়া গান সাধারণত নারীকেন্দ্রিক। নারীর জীবনকাহিনি, প্রেম-বিরহ, ব্যাকুলতা, যৌন আবেগ, বাল্যবিবাহ,মানব জীবন দর্শন, দারিদ্রতা, জটিলতা, শোষণ, আর্থিক সমস্যা, সাংসারিক জীবন যন্ত্রণা নিয়ে এই ভাওয়াইয়া গান তৈরি হয়। ভাওয়াইয়া গানকে কোন কোন শ্রোতা মন উদাস করার গান, ভাবের গান, আবার কেউ কেউ বায়ুবাহিত গান বলে থাকেন। করুণ বিচ্ছেদমূলক রসে গঠিত এই গানের সুর ভাঁজযুক্ত টানা সুর এবং লয় দীর্ঘ ও ধীর হয়। ভাওয়াইয়া গান প্রধানত রাজবংশী ভাষায় গাওয়া হয়। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার,আসামের গোয়ালপাড়া, ধুবড়ি, দিনাজপুরের উত্তরাংশ, বাংলাদেশের রংপুর বিভিন্নএই গান পরিবেশন করা হয়।

ঝুমুর গান-

Photo of ভারত এবং বাংলাদেশের চিরন্তন এক ঐতিহ্য: লোকসংগীত 4/7 by Deya Das

ঝুমুর মূলত একপ্রকার অতি প্রাচীন ঐতিহ্যময় প্রেমসংগীত। কৃষ্ণরাধার প্রেমলীলায় মত্ত বাঙালি ঝুমুর গানের মধ্যে তাদের প্রেমের পূর্ণতা দেন। প্রাথমিকভাবে ঝুমুরকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। লৌলিক ঝুমুর এবং দরবারি ঝুমুর। প্রথাগত দিক থেকে ঝুমুর ছয় প্রকার, যথা- নাচনি নাচের ঝুমুর, টাঁড় ঝুমুর, ছৌ নাচের ঝুমুর, খেমটা নাচের ঝুমুর, করম নাচের ঝুমুর, পাতা নাচের ঝুমুর। পুরুলিয়া বাঁকুড়া পশ্চিম মেদিনীপুর বিহার ঝাড়খণ্ড উড়িষ্যা আসাম এর কিছু অংশে এই ঝুমুর গান পরিবেশন করতে দেখা যায়।

সারিগান-

Photo of ভারত এবং বাংলাদেশের চিরন্তন এক ঐতিহ্য: লোকসংগীত 5/7 by Deya Das

নৌকার মাঝি-মাল্লারা স্রোতের টানে বৈঠা টেনে নৌকা চালানোর সময় এই ধরনের গান গেয়ে থাকেন। একঘেয়েমি জীবন থেকে মুক্তি লাভ, মৌলিক আবেগ এবং মনের আনন্দ প্রকাশের জন্যই তারা এইরকম গান গেয়ে থাকেন। এই গানে কোনও ভাবের গভীরতা নেই, রয়েছে বিষয়ের বৈচিত্র্যতা। পৌরাণিক রাধাকৃষ্ণ প্রসঙ্গ, ঐতিহাসিক নিমাই সন্ন্যাস প্রসঙ্গ, লৌকিক প্রেম ও জীবন, আধ্যাত্মিক দেবতত্ত্ব ও মরমীয়াবাদ, ব্যঙ্গকৌতুক আক্রমণ ও রঙ্গরসিকতা- সারিগান এই পাঁচ ভাগে বিভক্ত। তাল প্রধান লোকসংগীত হওয়ায় দাদরা কাহারবা তালেরপ্রভাত দেখতে পাওয়া যায়।

জারিগান-

Photo of ভারত এবং বাংলাদেশের চিরন্তন এক ঐতিহ্য: লোকসংগীত 6/7 by Deya Das

মহরমের সময় শোকের ছায়ায় এই জারিগান করা হয়। তবে মহরম মাস ছাড়া অন্য সময়ে সোনাভান, হাতেমতাই, বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনি নিয়ে জারি গান গাওয়া হয়ে থাকে। মূলত টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ অঞ্চলে উন্মুক্ত বৃক্ষ বা শামিয়ানার নিচে এই জারি গান পরিবেশন করতে দেখা যায়।

বাউল গান-

Photo of ভারত এবং বাংলাদেশের চিরন্তন এক ঐতিহ্য: লোকসংগীত 7/7 by Deya Das

বিশ্বের অন্যতম মরমিয়া সাধনা হল বাউল সাধনা। এই সাধনার মাধ্যমে বাউলেরা প্রেমের রূপের মধ্যে অরূপ সাধনা করে থাকেন। নিরাকার পরম আত্মার সন্ধানে বাউল সাধনার মূলমন্ত্র। বাঙালির আধ্যাত্মিকতা, আচার-অনুষ্ঠান, শরীর সাধনা, দেহবাদ, জাদুবিদ্যাচর্চা সবকিছুর মধ্যেই বাউল গান লক্ষ্য করা যায়। বাউলেরা ধর্মীয় সম্প্রদায় থেকে বেরিয়ে এসে গায়ক সম্প্রদায়ের হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করে একতারা হাতে নিয়ে নির্দিষ্ট আখড়ায় এনারা সমবেত হন। বাউলদের পাগল, ক্ষ্যাপা, গোসাঁই বলে ডাকা হয়। বিখ্যাত বাউল সংগীত শিল্পী ফকির লালন শাহ প্রায় ২ হাজার বাউল গান রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হল “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।”

মন ভালো করতে যে কোনো সময়ে শান্তিনিকেতন গেলে এই বাউল গানের সন্ধান মেলে। বর্তমানে লোকগীতি পরিবেশনের নিজস্ব ধারার থেকে বেরিয়ে অভিনবত্ব ছোঁয়ায় এই সংগীত গাওয়া হয়, যা শ্রুতি মধুর হলেও আবেগপ্রবণ নয়।

নিজের বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ট্রিপোটোর সঙ্গে ভাগ করে নিন আর সারা বিশ্ব জুড়ে অসংখ্য পর্যটকদের অনুপ্রাণিত করুন।

বিনামূল্যে বেড়াতে যেতে চান? ক্রেডিট জমা করুন আর ট্রিপোটোর হোটেল স্টে আর ভেকেশন প্যাকেজে সেগুলো ব্যবহার করুন।