কালকা থেকে সিমলা পৌঁছানোর যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা আমার জীবনের হয়তো অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতাগুলির মধ্যে একটি। হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলাকে বলা হয় পাহাড়ের রানি। হিমালয় পর্বতমালার উত্তর-পশ্চিম পরিসর থেকে ২২১৩ মিটার উচ্চতায় এটি অবস্থিত। যাত্রাপথ শুরু হয় কালকার প্রতিবেশী রাজ্যের ছোট শহর হরিয়ানা থেকে এবং তা শেষ হয় সিমলায়। কালকা থেকে সিমলা রেলপথটি খুব সংকীর্ণ এবং এটির দূরত্ব ৯৬ কিলোমিটার। এই ৯৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সময় যাত্রাপথে ৮৮৯ গুলি ছোট বড় সেতু এবং হিমালয়ের পাদদেশে ১০২ টি সুড়ঙ্গ পথ অতিক্রম করতে হয়।
১৯৩০ সালে এই সুরঙ্গগুলির পুনরায় নামকরণ করা হয়। ফলত, সেই সময় ১০৭ টি সুড়ঙ্গ থেকে কিছু অচল সুড়ঙ্গ বাদ পরে ১০৩ টি সুড়ঙ্গের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এরপর পুনরায় গণনার সময় দেখা যায় সোলান ব্রেয়েরি কাছে অবস্থিত ৪৬ নম্বর সুড়ঙ্গটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তাই সবশেষে মোট ১০২ টি সুড়ঙ্গের নামকরণ করা হয়।
বারগ আর তারা দেবী এই যাত্রাপথের সবচেয়ে দীর্ঘতম সুড়ঙ্গ। ১৯০০ এবং ১৯০৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সমস্ত সুড়ঙ্গগুলি নির্মাণ করা হয়। ধরমপুর ডিভিশনের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার এল. এডওয়ার্ডস ৩০টি সুড়ঙ্গের কাজ একা শেষ করেন। রেলপথ দপ্তর থেকে কর্মচারীদের এই সুড়ঙ্গগুলির মধ্যে বড় বড় আয়না এবং অ্যাসিটিলিন গ্যাসের ব্যবস্থাপনা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই যাত্রাপথের সবচেয়ে বড় সুড়ঙ্গ হল বারগ ( ৩৩ নং )। বারগ নামে একজন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারের নাম থেকেই সুড়ঙ্গটির নামকরণ করা হয়।
হিমালয়ের চর চাঁদনী পর্বতমালা থেকে ৫১২০ উচ্চতায় অবস্থিত হিমাচল প্রদেশের সোলান জেলার একটি ছোট্ট পার্বত্য স্টেশন হল বারগ। বারগ স্টেশনের ঠিক আগে সবচেয়ে দীর্ঘতম ১১৪৪ মিটার লম্বা বারগ সুড়ঙ্গটি অবস্থিত। ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার গতিবেগে একটি ট্রেনের এই সুড়ঙ্গটিকে পার করতে সময় নেয় ২.৫ মিনিট। স্থানীয় জনসাধারণের মতে এই সুড়ঙ্গটি পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সরলরেখায় অবস্থিত একটি সুড়ঙ্গ। কর্নেল বারগ একজন রেলপথের ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, যার উপর পাহাড় কেটে কালকা থেকে সিমলা রেলপথ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ বানানোর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল।
বারগ সুড়ঙ্গে কিছু বিচ্ছুরিত বেলে পাথর দেখতে পাওয়া যায়। এর পেছনে একটি করুণা দায়ক কাহিনি রয়েছে। ৩৩ নম্বর সুড়ঙ্গটি তৈরি করার জন্য কর্নেল বারগের উপর দায়িত্ব পড়ে। তিনি তার অজ্ঞতাবশত একটি ভুল করে ফেলেন। ৩৩ নম্বর সুড়ঙ্গটি উভয় প্রান্তে থেকে খননকার্য করা শুরু হয় এবং যার ফলে নির্মাণের গতিবেগ কিছুটা ভুল পথে চালিত হয়। তারপর কর্নেলের দলের সদস্যরা এই সুড়ঙ্গটিকে দুটি ভাগে ভাগ করে এবং বিপরীত প্রান্ত থেকে খনন ও বিস্ফোরণ করা শুরু হয়। কর্নেল তার দলের সদস্যদের বলেছিলেন যে মাঝখান থেকে দুটি সুড়ঙ্গকে মিলিয়ে দিয়ে একটি সুড়ঙ্গতে পরিণত করতে।
এইভাবে সুড়ঙ্গটি খুঁড়তে খুঁড়তে শ্রমিকরা যখন প্রায় পর্বতের মাঝখানে পর্যন্ত চলে আসে তখনও এটি মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। এর কিছুদিন পরে কর্নেলের এই সিদ্ধান্তের উপর দলের কর্মীদের ক্ষোভ জন্মাতে শুরু করে। ফলত কর্নেল নিজেও বুঝতে পারলেন তার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আর তার জন্যই এই সুড়ঙ্গের কাজ অসমাপ্ত রয়ে যায়। কর্নেল হতাশাগ্রস্ত হয়ে পরেন। ব্রিটিশ গভমেন্ট এই মারাত্মক ক্ষতির জন্য কর্নেলের কাছ থেকে এক টাকা ফাইন নেয়, প্রাকৃতিক সম্পত্তি নষ্ট করার উদ্যোগে। অন্যদিকে কর্নেলের রুপোর কর্মচারীরা বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। কারণ তাদের এই এতদিনের পরিশ্রম সব বিফলে যায়।
প্রবল অসন্তোষের কারণে সৃষ্টি হয় এক অস্বস্তিকর পরিবেশ। ঠিক তখনি ব্রিটিশ এই ইঞ্জিনিয়ার নিজের এত অপমান সহ্য করতে না পেরে দারুন হতাশা থেকে নিজেই নিজেকে গুলিবিদ্ধ করেন। তিনি যেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন পরবর্তীকালে সেখানে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে একটি বারগ পাইন উড হোটেল নির্মাণ করা হয়। শোনা যায়, বারগের কুকুর তার মালিকের রক্ত দেখে তাকে বাঁচানোর জন্য ছুটে যায় বর্তমান বারগ রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে। কিন্তু যখন সবাই এসে উপস্থিত হয় তখন বারগ তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তবে এই মৃত্যু নিয়েও যথেষ্ট মতভেদ আছে। অনেকে মনে করেন এই ইঞ্জিনিয়ার প্রথমে নিজের কুকুরকে মারেন তারপরে নিজের মারা যান। পুরো ঘটনাটি ঘটে কালকা-সিমলা জাতীয় সড়কে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বারগ সুড়ঙ্গের কাছে। অতঃপর থেকে এই সুড়ঙ্গটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কর্নেলের মৃত্যুর পর এইচ.এস. হের্লিংটোন নামে একজন মুখ্য ইঞ্জিনিয়ারকে নিযুক্ত করা হয় পুনঃরায় এখানে সুড়ঙ্গ নির্মাণের খননকার্য শুরু করার জন্য। কিন্তু হের্লিংটোনও পুনরায় আবার সেই অসুবিধার মধ্যে পরে যান। কারণ এখানে সুড়ঙ্গ তৈরী করার জন্য সমতল কোন জায়গার হদিস তিনি খুঁজে পান না। অবশেষে চাইল এর কাছে একজন স্থানীয় সাধু বাবা ভালকুর থেকে সাহায্য নিয়ে হের্লিংটোন রেলওয়ে সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ভূখণ্ড জরিপ করতে শুরু করেন। সবশেষে প্রাথমিক জায়গা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে এই সুড়ঙ্গটিড় খননকার্য শুরু হয় এবং এটি শেষ হতে মোট খরচ হয় ৮.৪০ লক্ষ টাকা। ১৯০০ সালে এটি খননকার্য শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৯০৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে। ৩৩ নম্বর সুড়ঙ্গটি দ্বারা কর্নেলকে সম্মান জানানোর জন্য এই সুড়ঙ্গটিড় নামকরণ করা হয় বারগ। এটা মনে করা হয় বাবা ভালকুর মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটি ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা ছিল। তিনি সিমলা থেকে কালকা রেলপথে সুড়ঙ্গ নির্মাণ করতে ইঞ্জিনিয়ারদের বহু সাহায্য করেন।
কর্নেলের মৃত্যুর পর সেই স্থানে প্রেতাত্মা সব আজগুবি গল্প শুনতে পাওয়া যায়। বলা হয়, অনেকেই সুড়ঙ্গের আশপাশে কর্নেলের প্রেতাত্মাকে দেখতে পান। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে শোনা যায় কর্নেল ভূত হয়েও এক বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে থাকেন। কারোও কারোও মতে এখানে বেশ কিছু মানুষকে এই সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় বা কখনও কখনও একা বসে কর্নেলের সঙ্গে গল্প করতে দেখা যায়। তবে যাই হয়ে থাকুক না কেন এই সুড়ঙ্গের অন্ধকারের মধ্যে অদ্ভুত কিছু রহস্য আছে বলে আমার মনে হয়েছে। সুড়ঙ্গটির মধ্যে দিয়ে পারাপার হওয়ার সময় ভেজা পাথর এবং ঘুণ ধরা দেওয়াল চোখে পরে।
এবার বলব ৪৬ এবং ১০৩ নম্বর সুড়ঙ্গের গল্প। যেগুলি আসলেই ভুতুড়ে সুড়ঙ্গ নামে পরিচিত। তবে এই ভুতুড়ে গল্পের সঙ্গে যেটি সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হল এই সুড়ঙ্গটি রেলপথের সবচেয়ে বৃহত্তম এবং পৃথিবীর অন্যতম লম্বা সুড়ঙ্গ। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব আনন্দদায়ক।